আকাইদ আরিফুল

অধিকাংশ অপেক্ষাই অনিশ্চিত

মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ হলো ‘অপেক্ষা’। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনো কিছুর জন্য প্রহর গোনে। কখনো এই অপেক্ষা হয় কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের, কখনো প্রিয়জনের সান্নিধ্যের, আবার কখনো কেবলই একটি সুন্দর আগামীর। কিন্তু জীবনের রুক্ষ বাস্তবতা হলো, আমাদের জীবনের অধিকাংশ অপেক্ষাই অনিশ্চিত। এই অনিশ্চয়তা যেমন মানুষকে আশাবাদী করে বাঁচার রসদ জোগায়, তেমনি অনেক সময় তা পরিণত হয় তীব্র যন্ত্রণার এক নীরব দহনে।

মানুষ স্বভাবতই আশাবাদী প্রাণী, আর এই আশাই জন্ম দেয় অপেক্ষার। আমরা যখন কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করি, তখন আমাদের অবচেতন মন একটি নির্দিষ্ট ফলাফল বা প্রাপ্তির চিত্র কল্পনা করে নেয়। একজন কৃষক যেমন রুক্ষ প্রান্তরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করেন, একজন বেকার যুবক একটি চাকরির চিঠির আশায় প্রহর গোনেন, ঠিক তেমনি একজন মা তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করেন তার দূরদেশে থাকা সন্তানের ফেরার। এই প্রতিটি অপেক্ষার কেন্দ্রে থাকে একটি গভীর বিশ্বাস। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম বা জাগতিক বাস্তবতা সবসময় মানুষের এই বিশ্বাসের সঠিক প্রতিদান দেয় না, আর তখনই শুরু হয় অনিশ্চয়তার খেলা।

অপেক্ষার সবচেয়ে কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক দিকটি হলো এর এই অনিশ্চয়তা। যখন আমরা জানি না যে আমাদের অপেক্ষার প্রহর কখনো শেষ হবে কি না, তখন প্রতিটি মুহূর্ত যেন একেকটি দীর্ঘ যুগের মতো মনে হয়। একটি জটিল মেডিকেল রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা, নিখোঁজ মানুষের ফিরে আসার অপেক্ষা কিংবা প্রিয়জনের অভিমান ভাঙার অপেক্ষা— এগুলোর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা নিশ্চয়তা নেই। অনিশ্চিত এই অপেক্ষা মানুষকে মানসিকভাবে চরম পরিশ্রান্ত করে তোলে। আশা এবং নিরাশার দোলাচলে দুলতে দুলতে মানুষের মন একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তবুও সে অপেক্ষায় থাকে।

অনেক সময় আমরা এমন কিছুর জন্য অপেক্ষা করি, যার বাস্তবে রূপ নেওয়ার কোনো সম্ভাবনাই থাকে না। এটি অনেকটা মরুভূমির মরীচিকার মতো। আমরা ভাবি সামনেই পূর্ণতা আছে, কিন্তু কাছে গেলে দেখি শুধুই হাহাকার আর শূন্যতা। যে মানুষটি আর কখনো ফিরবে না তার জন্য প্রহর গোনা, কিংবা ফেলে আসা অতীতকে ফিরে পাওয়ার যে বৃথা আকাঙ্ক্ষা— তা মূলত আমাদের জীবনকে স্থবির করে দেয়। জীবনের এই ধ্রুব সত্যটি মেনে নেওয়া কঠিন হলেও বাস্তব যে, সব অপেক্ষার শেষ সুন্দর হয় না। কিছু অপেক্ষা কেবলই দীর্ঘশ্বাস হয়ে শূন্যতায় মিলিয়ে যায়।

তবে অধিকাংশ অপেক্ষা অনিশ্চিত হলেও, এই অপেক্ষারও একটি নিজস্ব সৌন্দর্য ও আত্মিক শিক্ষা রয়েছে। অনিশ্চিত অপেক্ষা মানুষকে চরম ধৈর্যশীল ও সহনশীল হতে শেখায়। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে প্রতিকূল ও অজানা পরিস্থিতিতেও মানসিকভাবে স্থির থাকতে হয়। তাছাড়া, যখন কোনো দীর্ঘ অপেক্ষার ফল শূন্য হয়, তখন তা আমাদের জীবনের রূঢ় বাস্তবতার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। আমরা শিখতে পারি কখন একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনে সামনে এগিয়ে যেতে হয়। একে বলা যায় ছেড়ে দেওয়ার শিল্প, যা জীবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

"অধিকাংশ অপেক্ষাই অনিশ্চিত"— কথাটি শুনতে নৈরাশ্যবাদী মনে হলেও, এটিই জীবনের অন্যতম বড় সত্য। আমাদের বুঝতে হবে যে, অপেক্ষার ফলাফল যাই হোক না কেন, জীবনের গতি কখনো থেমে থাকে না। তাই অনিশ্চিত কোনো অপেক্ষার জালে নিজেকে আজীবন আটকে রেখে বর্তমানের সুন্দর মুহূর্তগুলোকে নষ্ট করা কোনোভাবেই উচিত নয়। অপেক্ষার অনিশ্চয়তাকে মেনে নিয়েই আমাদের বাঁচতে হবে; কারণ একটি অপেক্ষা ব্যর্থ হওয়ার অর্থ জীবনের সমাপ্তি নয়, বরং তা নতুন কোনো অধ্যায় ও অভিজ্ঞতার সূচনা মাত্র। -আরিফুল